ইট-পাথরের ধূসর নগরী ঢাকায় এক চিলতে সবুজ এখন অনেকেরই প্রাণের স্পন্দন। ছাদবাগান বা বারান্দাবাগান এখন কেবল শখ নয়, বরং পরিবারের পুষ্টির জোগান আর মানসিক প্রশান্তির অন্যতম উৎস। তবে একটি সুন্দর বাগানের মূল ভিত্তি হলো তার মাটি। ঢাকার এই কৃত্রিম পরিবেশে ভালো মানের মাটি খুঁজে পাওয়া অনেকের জন্যই চ্যালেঞ্জিং।
এই প্রতিবেদনে আমরা জানাব ছাদবাগানের জন্য কোন মাটি সেরা, তার বৈশিষ্ট্য এবং ঢাকার কোথায় সাশ্রয়ী দামে মাটি পাওয়া যায়।
ছাদবাগানের জন্য আদর্শ মাটি কোনটি?
অভিজ্ঞ নার্সারি মালিকদের মতে, ছাদ বা বারান্দাবাগানের জন্য সবচেয়ে উপযোগী হলো বেলে দোআঁশ মাটি। বালু, পলি ও কাদার সুষম মিশ্রণ এই মাটিকে চাষাবাদের জন্য অনন্য করে তোলে। বিশেষ করে টব, ড্রাম বা সবজি বেডে লাগানো গাছে এই মাটি শিকড়, পানি ও বাতাসের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
বেলে দোআঁশ মাটির গুণাগুণ:
সুষম মিশ্রণ: এতে সাধারণত ৪০-৫০% বালুকণা, ২০-৩০% পলিকণা এবং ২০-৩০% কাদাকণা থাকে।
জৈব উপাদানের উপস্থিতি: ৩-৫% হিউমাস বা জৈব পদার্থ থাকে, যা মাটির প্রাণ হিসেবে কাজ করে। এটি উপকারী ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে গাছের পুষ্টি গ্রহণ সহজ করে তোলে।
পানি নিষ্কাশন: বালুকণা মাটিকে হালকা রাখে, ফলে টবে অতিরিক্ত পানি জমে শিকড় পচে যাওয়ার আশঙ্কা অনেকটাই কমে আসে।
আর্দ্রতা রক্ষা: কাদাকণা মাটিকে প্রয়োজনীয় দৃঢ় রাখে এবং গাছের শিকড়ের জন্য দরকারি আর্দ্রতা দীর্ঘ সময় ধরে রাখতে সাহায্য করে।
ঢাকার কোথায় পাবেন এই মাটি?
ঢাকার বড় নার্সারিগুলোতে এখন ছাদবাগানের উপযোগী প্রস্তুত মাটি পাওয়া যায়। উল্লেখযোগ্য কিছু এলাকা হলো:
উত্তর ঢাকা: দিয়াবাড়ী (উত্তরা), মিরপুর বোটানিক্যাল গার্ডেন এলাকা, গাবতলী।
মধ্য ও পূর্ব ঢাকা: নতুন বাজার (১০০ ফিট), আফতাবনগর, খিলগাঁও, বাসাবো।
দক্ষিণ ঢাকা: যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, আমিনবাজার ও বেড়িবাঁধ এলাকা।
এসব নার্সারি থেকে কেনা মাটির সুবিধা হলো জৈব সার হিসেবে গোবর ও বালুসহযোগে এই মাটি অনেকটাই প্রস্তুত থাকে, যা সরাসরি টব বা ড্রামে ব্যবহার করা যায়।
মাটির দরদাম ও বিক্রির নিয়ম
নার্সারিতে মাটি সাধারণত সিএফটি (CFT) বা ঘনফুট হিসেবে বিক্রি হয়। আপনার বাগানের প্রয়োজন অনুযায়ী মাটি কেনার দুটি প্রধান পদ্ধতি রয়েছে:
খুচরা ক্রয়: ছোট বাগান বা অল্প কিছু টবের জন্য সিমেন্টের বস্তায় ভরা মাটি কিনতে পারেন। প্রতি বস্তায় সাধারণত এক থেকে দেড় সিএফটি মাটি থাকে, যার দাম পড়ে ৫০ থেকে ৬০ টাকার মতো।
পাইকারি বা বাল্ক ক্রয়: বড় পরিসরে বাগান করার জন্য ট্রাক ভর্তি করে ২০০ থেকে ৪০০ সিএফটি খোলা মাটি নেওয়া সাশ্রয়ী। সেক্ষেত্রে প্রতি সিএফটি মাটির দাম পড়ে মাত্র ২৮ থেকে ৩০ টাকা, যা খুচরা দামের প্রায় অর্ধেক।
রেডি মিক্সড মাটি: আধুনিক সমাধান
যাঁরা মাটি তৈরি বা সার মেশানোর ঝামেলায় যেতে চান না, তাঁদের জন্য বাজারে রয়েছে 'রেডি পটিং মিক্সড'। এতে দোআঁশ মাটির সঙ্গে জৈব সার, ভার্মিকম্পোস্ট, ট্রাইকোডার্মা, কোকো পিট, হাড়ের গুঁড়া ও খইলসহ প্রয়োজনীয় উপাদান মেশানো থাকে।
জনপ্রিয় কিছু ব্র্যান্ড ও দাম:
এসিআই অরণ্য: এদের ৫ কেজির রেডি মিক্সড প্যাকেটের দাম ১৮৯ টাকা, ১০ কেজি ৩৪৫ টাকা এবং ২৫ কেজির প্যাকেট ৫২৫ টাকায় পাওয়া যায়।
মাই গার্ডেন বিডি: এদের ৫ কেজির প্যাকেট ১৭৫ টাকা, ১০ কেজি ৩২০ টাকা এবং ২৫ কেজির প্যাকেট ৫৯৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সিরাজ টেক: এই ব্র্যান্ডের রেডি মিক্সড মাটি প্রতি কেজি ২৮ টাকা দরে পাওয়া যায়।
ছাদবাগানে নতুন শুরু করা বা অল্পসংখ্যক টবের জন্য এই ছোট প্যাকেটগুলোই বর্তমানে বেশি জনপ্রিয়।
অভিজ্ঞ মালির ৫টি জরুরি পরামর্শ
নার্সারি ব্যবসায়ীদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে ছাদবাগানিদের জন্য কিছু মূল্যবান টিপস নিচে দেওয়া হলো:
মাটি পরীক্ষা: একসঙ্গে অনেক মাটি না কিনে আগে অল্প পরিমাণ এনে পরীক্ষা করুন। মাটির মান বুঝতে এতে কিছু শর্ষে বা মেথির বীজ বুনে দেখতে পারেন। ৩-৫ দিনের মধ্যে বীজ অঙ্কুরিত হলে বুঝবেন মাটি ভালো।
উর্বরতা রক্ষা: বছরে অন্তত একবার পুরোনো মাটির সঙ্গে নতুন কম্পোস্ট বা জৈব সার যোগ করলে মাটির উর্বরতা বজায় থাকে।
ছাদের ওজন কমানো: ছাদের ওপর অতিরিক্ত ওজন এড়াতে মাটির সঙ্গে নারকেলের খোসা থেকে তৈরি কোকো পিট বা কোক ডাস্ট যোগ করতে পারেন। এতে মাটি হালকা থাকে।
সরাসরি প্রয়োগ: রেডি মিক্সড মাটি ব্যবহারের বড় সুবিধা হলো এতে আলাদা করে সার মেশানোর প্রয়োজন পড়ে না, যা নতুন বাগানীদের জন্য সহজ।
শিকড় বৃদ্ধি: দোআঁশ মাটি শিকড় চলাচলে বাধা দেয় না এবং বাতাসের চলাচল ঠিক রাখে, ফলে গাছের বৃদ্ধি আশানুরূপ হয়।
একটি সুস্থ সবল গাছ মানেই রোগবালাই কম এবং প্রচুর ফলন। তাই বাগান শুরুর আগে সঠিক মাটি নির্বাচনে গুরুত্ব দিন। আপনার হাতের ছোঁয়ায় ঢাকার প্রতিটি ছাদ হয়ে উঠুক একেকটি সবুজ অরণ্য।

0 Comments