বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তার ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হতে যাচ্ছে। চীনা কৃষিবিজ্ঞানীরা এমন এক বৈপ্লবিক হাইব্রিড ধান উদ্ভাবন করেছেন যা বীজের মাধ্যমেই নিজেকে ‘ক্লোন’ বা হুবহু প্রতিলিপি তৈরি করতে পারে। এই আবিষ্কারের ফলে প্রতি বছর কৃষকদের চড়া দামে নতুন হাইব্রিড বীজ কেনার চিরাচরিত বাধ্যবাধকতা ভেঙে যাবে। ফলে এই উদ্ভাবন বৈশ্বিক কৃষি অর্থনীতিতে এক বিশাল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
চীনা একাডেমি অব এগ্রিকালচারাল সায়েন্সেসের অধীনে ‘চায়না ন্যাশনাল রাইস রিসার্চ ইনস্টিটিউট’-এর বিজ্ঞানী ওয়াং কেজিয়ানের নেতৃত্বে এই গবেষণাটি সম্পন্ন হয়েছে। বিজ্ঞানীরা ধানের প্রজনন প্রক্রিয়ায় ‘এপোমিক্সিস’ পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন, যেখানে নিষেক বা ফার্টিলাইজেশন ছাড়াই বীজ তৈরি হয়। এই নতুন ‘Fix8’ সিরিজের ধানে ক্লোনিংয়ের কার্যকারিতা ৯৯ দশমিক ৭ শতাংশেরও বেশি, যা প্রথাগত হাইব্রিড ধানের ফলন ধরে রেখেই বংশপরম্পরায় একই গুণাগুণ বজায় রাখতে সক্ষম।
হাইব্রিড ধান উদ্ভাবনের পর থেকে এর সবচেয়ে বড় বাধা ছিল এর উচ্চমূল্য এবং পুনরুৎপাদনে বাধা। সাধারণ ধানের তুলনায় হাইব্রিড বীজের দাম প্রায় ১০০ গুণ বেশি হয়। চীনে ১ কেজি হাইব্রিড বীজের দাম যেখানে প্রায় ২০০ ইউয়ান (২৮ মার্কিন ডলার), সেখানে নতুন এই ক্লোনিং পদ্ধতিতে বীজের উৎপাদন খরচ ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাবে।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই প্রযুক্তি বাণিজ্যিকভাবে সফল হলে বাজারে বহুজাতিক বীজ কোম্পানিগুলোর একচেটিয়া আধিপত্য হুমকির মুখে পড়বে। বর্তমানে কৃষকদের প্রতি মৌসুমে নতুন বীজ কিনতে হয়। এতেই তাঁদের আয়ের বড় একটি অংশ চলে যায়। চীনের এই ‘ওয়ান-লাইন’ সিস্টেম এই অর্থনৈতিক শৃঙ্খল ভেঙে কৃষককে স্বাবলম্বী করে তুলবে বলে আশা করা যায়।
বিশ্বজুড়ে কয়েকশ কোটি মানুষ যখন তীব্র খাদ্য সংকটের মুখে, তখন হাইব্রিড ধানের এই ক্লোনিং প্রযুক্তি আশার আলো দেখাচ্ছে। আফ্রিকার বিভিন্ন অংশে সাধারণ ধানের তুলনায় হাইব্রিড ধান প্রায় চারগুণ বেশি ফলন দিতে সক্ষম। যদি এই স্বয়ং-প্রজননশীল হাইব্রিড ধান বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তবে সামগ্রিক ধান উৎপাদন দ্বিগুণ করা সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা ‘হুয়াক্সু’ নামক একটি বিশেষ জিন শনাক্ত করেছেন, যার নামকরণ করা হয়েছে একটি চীনা রূপকথার চরিত্র থেকে যা ‘পিতা ছাড়াই জন্ম’ হওয়া বোঝায়। এই জিনের প্রয়োগের ফলে ভ্রূণ গঠন প্রক্রিয়ায় কোনো বাহ্যিক নিষেকের প্রয়োজন হয় না। গবেষণার তৃতীয় প্রজন্ম পর্যন্ত দেখা গেছে ধানের গুণগত মান বা ফলনের কোনো পরিবর্তন হয়নি।
হাইব্রিড ধানের জনক প্রয়াত ইউয়ান লংপিং এই গবেষণার প্রাথমিক পর্যায়ে একে ‘অসাধ্যসাধন’ বলে অভিহিত করেছিলেন। বর্তমানে এই গবেষণার ফলাফল পিয়ার-রিভিউ-এর অপেক্ষায় রয়েছে। দক্ষিণ চীনের হাইনান এবং পূর্বের ঝেজিয়াং প্রদেশে ইতিমধ্যে ছয়টি প্রজাতির ক্লোন ধানের সফল পরীক্ষা চালানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের এই প্রযুক্তি কেবল কৃষকদের খরচই কমাবে না, বরং চরম জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে বিশ্বজুড়ে সুলভ ও টেকসই খাদ্য সরবরাহের নিশ্চয়তা দেবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের চলমান প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার মধ্যে এই কৃষি-বিপ্লব বেইজিংকে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে এক অনন্য সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে।
সূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট
- Home-icon
- ফসল
- _শাক-সবজি
- _দানাশস্য
- _ডাল
- _তেলবীজ
- _ফল
- _অর্থকরী ফসল
- __ফুল
- __মসলা
- __ভেষজ
- __কাঠ
- __তুলা-রেশম
- __চা-পান
- _বিদেশী
- বিশেষ
- পশু-পাখি পালন
- _উন্নত জাত
- __গরু
- __ছাগল
- __মুরগি
- __হাঁস
- _খাদ্য ও পুষ্টি
- _রোগ-বালাই
- _ভ্যাকসিন
- _ডেইরি
- _মোটাতাজাকরণ
- মৎস্য চাষ
- জৈব কৃষি
- বিকল্প খামার
- কৃষি প্রযুক্তি
- কৃষি যন্ত্রপাতি
- দরকারি তথ্য
- ডিজিটাল বই

0 Comments